
মাগুরা সংবাদদাতাঃ
মাগুরার ঐতিহ্যবাহী নবগঙ্গা নদী এখন দখল-দূষণে যেন নালায় পরিণত হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে নদীর দুই পাড়ের জমি দখল করে অবৈধভাবে বাড়িঘর, দোকানপাটসহ বিভিন্ন স্থাপনা। বাজার, দোকানপাট, ড্রেন ও গৃহস্থালির বর্জ্যে বিভিন্ন অংশে ভরাট হয়ে গেছে নদীর তলদেশ। নাব্যতা কমে বর্ষা মৌসুমেও নদীর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ দেখা যায় না। প্লাস্টিক, আবর্জনা ও কচুরিপানা জমে দূষিত হচ্ছে নদীর পানি। ধ্বংস হচ্ছে মাছের বিচরণ ও স্বাভাবিক প্রজনন পরিবেশ। সংকুচিত হয়ে পড়েছে নদীর আয়তন। স্থানীয়রা দ্রুত এই নদীকে বাঁচাতে খনন সহ উচ্ছেদ অভিযান করে এর স্বাভাবিক গতিপথ ফিরিয়ে দেবার দাবী জানিয়েছে।
জানা গেছে, কুমার ও নবগঙ্গা দুটোই চুয়াডাঙ্গার মাথাভাঙ্গা নদী থেকে উৎপন্ন হয়ে মাগুরা শহর অংশে মিলিত হয়ে নবগঙ্গা নাম ধারণ করে নড়াইলে চলে গেছে। এর মধ্যে ১২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ কুমার নদ চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা মাথাভাঙ্গা নদী থেকে উৎপন্ন হয়ে কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ হয়ে মাগুরা শহরে এসে নবগঙ্গা নদীতে পতিত হয়েছে। একসময় এটি পদ্মার শাখা নদী ছিল। এদিকে চুয়াডাঙ্গা সদরে মাথাভাঙ্গা নদী থেকে উৎপন্ন নবগঙ্গা ঝিনাইদহ সদর উপজেলার মধ্য দিয়ে মাগুরা সদর উপজেলায় প্রবেশ করেছে। ২১৪ কিলোমিটার দীর্ঘ নদীটির মাগুরা শহরে কুমার নদে মিলিত হওয়ার আগ পর্যন্ত একেবারে নালায় পরিণত হয়েছে।
স্থানীযদের মতে, এ অঞ্চলের মানুষের কাছে নবগঙ্গা শুধু একটি নদী ছিল না, ছিল জনপদের জীবনধারার অংশ। প্রবাহমান নবগঙ্গার বুকে একসময় স্রোতের টান ছিল। নদীপথে নৌকা চলত, জেলেদের জালে উঠত নানা প্রজাতির মাছ। এই নদীকে ঘিরেই এ জনপদে গড়ে উঠেছিল ব্যবসা-বাণিজ্য, বসতি ও জীবিকার নানা আয়োজন।
তাদের অভিযোগ, কর্তৃপক্ষের অবহেলা ও অব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিন ধরে চলা দখল ও দূষণে নদীটির ঐতিহ্য এখন বিলীনের পথে। তাদের আশঙ্কা, নবগঙ্গা রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে দ্রুতই নদীর স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হারিয়ে যাবে।
নদীটির এ অবস্থার জন্য কর্তৃপক্ষের উদাসীনতাকেই দায়ী করে স্থানীয়রা। তাদের মতে, নদী রক্ষার দায়িত্বে যারা আছেন তাদের সঠিক তদারকির অভাব রয়েছে।
এ নদীর বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখা যায়, নদীসংলগ্ন শহরের নতুন বাজার এলাকার বহু স্থাপনা নদীর দুই পাড়ে গড়ে উঠেছে। এসব স্থাপনার মধ্যে দোকানপাট, গুদাম ও হোটেলের পেছনের অংশ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এগুলোর বেশির ভাগই নদীর জমি দখল করে গড়ে উঠেছে। এছাড়া দোকানপাট ও ড্রেনের লাইন নদীতে এসে মিশেছে। হোটেলগুলো থেকে ফেলা মিষ্টির প্যাকেট ও মাটির তৈরি খুঁটিতে নতুন বাজার সেতুর নিচে অনেকটা ভরাট হয়ে গেছে। সেতুটির পশ্চিম দিক চলে গেছে ঝিনাইদহের দিকে। এদিকে নদীর তীর দখল করে বাড়িঘর স্থাপনের অভিযোগ রয়েছে। আর পূর্ব দিক গিয়ে মিশেছে কুমার নদের সঙ্গে, যা স্থানীয়ভাবে মূল নবগঙ্গা নামে পরিচিত। এ অংশে নদীর তীর দখল করে বাড়িঘরের পাশাপাশি বহুতল ভবন নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে। নদীতে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ না থাকায় কচুরিপানা ও শেওলা জমে আছে। এর সঙ্গে বর্জ্যসহ প্লাস্টিকের নানা আবর্জনা ভাসতে দেখা যায়। নদীর তীরের বিভিন্ন জায়গাই দেখা গেছে আবর্জনার স্তূপ।
স্থানীয় পরিবেশবিদরা মনে করেন, নদীর পানি ও প্রবাহের সঙ্গে জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। পানির গুণগত মান নষ্ট হলে কিংবা নদীতে পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে জলজ প্রাণীর আবাসস্থলও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। প্লাস্টিক, পলিথিন, গৃহস্থালি বর্জ্যসহ নানা ধরনের আবর্জনা নদীতে জমতে থাকলে পানির স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি তীরবর্তী এলাকাতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। পরিবেশ রক্ষায় নদীতে আবর্জনা ফেলা বন্ধ করার পাশাপাশি বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
নতুন বাজার এলাকার জেলে সুকুমার জানান, একসময় এ নদী দিয়ে বড় নৌযান চলত। আমরা মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতাম। এখন নদীটি সংকুচিত হওয়ায় সে নৌযানও চলে না, আর মাছ ধরার পরিবেশও নেই।
নান্দুয়ালী গ্রামের বাসিন্দা মাসুম বিল্লাহের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে নদীর তীর ও প্রবাহপথের ওপর যথাযথ কর্তৃপক্ষের নজরদারি না থাকায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। নদীতে গৃহস্থালি বর্জ্য ও বিভিন্ন ধরনের আবর্জনা ফেলার কারণেও দূষণ বাড়ছে। নদীর নাব্যতা ফেরাতে নদী খননের দাবি করেছেন শিবরামপুর গ্রামের বাসিন্দা ওহিদুল ইসলাম।
স্থানীয় পরিবেশবাদী এটিএম আনিসুর রহমান বলেন,আমরা দীর্ঘদিন ধরে নবগঙ্গা নদী রক্ষার দাবি জানিয়ে আসছি। শুধু অভিযান চালিয়ে নদী রক্ষা করা সম্ভব নয়। দখলদারদের বিরুদ্ধে নিয়মিত ব্যবস্থা নেয়া, নদীর সীমানা নির্ধারণ ও উদ্ধার করা এবং দূষণের উৎসগুলো বন্ধ করতে হবে।
মাগুরা পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী সন্তোষ কর্মকার জানান, দেশব্যাপী ২০ হাজার কিলোমিটার জলাধার খনন প্রকল্পের আওতায় মাগুরার নবগঙ্গা নদীর ৪৪ কিলোমিটার খনন কাজ খুব তাড়াতাড়ি শুরু করতে যাচ্ছে সরকার।
কৃ/স/জয়