কৃষি সময়
প্রকাশ : Oct 1, 2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

কচুরিপানায় আটকা ২৭ হাজার হেক্টর জমির চাষাবাদ

নাটোর সংবাদদাতাঃ 
চলনবিলে বন্যার পানিতে আসা কচুরিপানা আটকা পড়ে তিন উপজেলার ২৭ হাজার হেক্টর কৃষি জমিতে চাষাবাদের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এসব উপজেলাগুলো হচ্ছে নাটোর জেলার গুরুদাসপুর,সিংড়া ও নলডাঙ্গা। স্থানীয় কৃষকরা বলছেন দ্রুত এই কচুরিপানা অপসারণ করা না গেলে আসন্ন রবি মৌসুমে এসব জমিতে কোনভাবেই চাষাবাদ করা সম্ভব হবে না। 

চলনবিলের গুরুদাসপুরের খুবজীপুর, বিলশা, শ্রীপুর, পিঁপলা, বামনবাড়িয়া, মশিন্দার ১০ নম্বর ব্রিজ এলাকা, নাদোসৈয়দপুর, বিলকাঠুর, বিলব্যাসপুর, যোগেন্দ্রনগর, বিলহরীবাড়ী, হরদমা, সিংড়ার ডাহিয়া, ইতালী, চৌগ্রাম, কলম, তাজপুর ও শেরকোল বেড়াবাড়ি, কাউয়াটিকরি, ইন্দ্রাসন, মাগুড়া, বিলতাজপুর, সাতপুকুরিয়া, ইটালী, ডাহিয়া, সারদানগর, শেরকোল, চৌগ্রাম, জোলারবাতা এবং তাড়াশের রুহাই, কুন্দইল, হান্ডিয়ালসহ কমপক্ষে ২০ বিলের বিস্তীর্ণ পানিতে এখন কচুরিপানা ভাসছে। সময়মতো অপসারণ না করলে গত মৌসুমের মতো এবারও এসব বিলের বিপুল পরিমাণ জমি অনাবাদি থাকার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

প্রতি বছর বর্ষার পর এসব বিলের জমিতে রবি মৌসুমে প্রায় এক লাখ হেক্টর জমিতে গম, ভুট্টা, রাই-সরিষা, ইরি, বোরো ধানসহ মসলা জাতীয় শস্য চাষ হয়। বিশেষ করে জেলার গুরুদাসপুরের এক হাজার, সিংড়ার ১৫ হাজার  ও নলডাঙ্গা উপজেলার নিম্নাঞ্চলের ৫ হাজার এবং পার্শ্ববর্তী তাড়াশ উপজেলার ৪ হাজারসহ প্রায় ২৭ হাজার হেক্টর জমির ওপরে কচুরিপানার বিস্তার। পানি নেমে যাওয়ার পর এসব জমিতে রাই-সরিষা, গম ভুট্টা ও রসুনের আবাদ হয়। কিন্তু এবারের চিত্র ভিন্ন। কচুরিপানার বিস্তার রোধে কৃষকরা একক প্রচেষ্টায় হিমশিম খাচ্ছেন।

বিল ঘুরে দেখা গেছে, বিলের পানির ওপর কচুরিপানা সবুজ গালিচা বিছিয়েছে। দেখতে সুন্দর লাগলেও এটিই কৃষকের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কৃষকদের দুশ্চিন্তার পাশাপাশি নৌ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। উন্মুক্ত জলারাশির মৎস্যজীবীরাও মাছ শিকার করতে পারছেন না। মূলত চলনবিলের বিভিন্ন এলাকায় অপরিকল্পিতভাবে বাঁধ ও রাস্তা-ঘাট নির্মাণ এবং দখল-দূষণে নদী সংকুচিত হওয়ায় পানিতে ভাটির টান নেই। ফলে কচুরিপানা আটকে বৃহৎ পরিসরে বংশ বিস্তার করছে।

সিংড়া কৃষি অফিসের তথ্যনুর্যায়ী, ২০২৫ সালে বানের পানির সঙ্গে ভেসে এসে আর ফেরত যায়নি কচুরিপানা। ফলে বোরো মৌসুমে জোলারবাতা ও চৌগ্রাম বিলেই প্রায় ১০০ হেক্টর জমিতে কোনও আবাদ করা যায়নি। বন্যা পরবর্তী সময় বিলে বোরো ধান, গম ও সরিষা চাষাবাদ করতে না পেরে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন কৃষকরা। কষি বিভাগও সরিষা আবাদে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি। 

বিলের পানিতে কচুরিপানা দীর্ঘস্থায়ী অবস্থান শুধু চাষাবাদে প্রভাব ফেলছে তা নয়। বিলের লতাগুল্ম এবং জলজ উদ্ভিদও ধ্বংস করছে। বিলে শাপলা-পদ্ম ফুলের দেখা নেই।  

এদিকে বিলের উন্মুক্ত জলারাশি কচুরিপানার দখলে থাকায় মৎস্যজীবীদের জীবিকায় টান পড়েছে। মঙ্গাভাব তৈরি হয়েছে পর্যটন কেন্দ্রিক পেশাতেও।
ডাহিয়া গ্রামের মৎস্যজীবী জুলহাজ হোসেন বলেন, বর্ষায় চলনবিলে মাছ ধরে তার সংসার চলতো। এই বর্ষায় কচুরিপানায় বিস্তীর্ণ বিল একাকার হয়ে গেছে। ফলে সুবিধামতো মাছ ধরতে পারছেন না। তারমতো কয়েক হাজার মৎস্যজীবী মাছ ধরতে না পেরে চরম বিপাকে পড়েছেন।

বিলশা, যোগেন্দ্রনগর, বিলব্যাসপুর ও কুন্দইল গ্রামের কৃষকরা জানান, গত কয়েক বছর ধরে ভালো ফসল ফলানো সম্ভব হয়নি। এ বছর আবার কচুরিপানার স্থায়িত্ব কৃষকের কপালে নতুন করে চিন্তার ভাঁজ ফেলে দিয়েছে। বিশেষ করে বর্গাচাষিরা কচুরিপানা অপসারণ করে জমি চাষাবাদের উপযোগী করে তুলতে হিমশিম খাচ্ছেন। অনেকেই চরা সুদে মহাজনি ঋণ নিয়ে জমি প্রস্তুতের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

কৃষকদের ভাষ্যমতে, জমি থেকে কচুরিপানা অপসারণ করা শুধু ব্যয়বহুলই নয়, কষ্টসাধ্যও। রয়েছে শ্রমিক সংকটও। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে শ্রমিকরা মজুরি বাড়িয়ে দিন হাজিরা ৬০০ টাকা নিচ্ছেন। প্রতি বিঘা জমির কচুরিপানা পরিষ্কার করতে কমপক্ষে ১০ থেকে ১২ শ্রমিক প্রয়োজন হচ্ছে। এতে বিঘায় অপসারণ করতে কৃষকের সার্বিক ব্যয় হচ্ছে ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা। বাড়তি এই ব্যয়ের জোগান দেওয়া কৃষকের জন্য দুরূহ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ধারদেনা করে হলেও ফসলি জমি থেকে কচুরিপানা অপসারণের প্রাণপণ চেষ্টা করছেন কৃষকরা।

বেড়াবাড়ি গ্রামের কৃষক রফিকুল ইসলাম জানান, গত বছর তিনি ১০ হাজার টাকা ব্যয়ে এক বিঘা জমির কচুরিপানা পরিষ্কার করে ধান রোপণ করেছিলেন। আগাম বন্যায় এবং অতিবৃষ্টির কারণে পাকা ধান কেটে ঘরে তোলা সম্ভব হয়নি। এবারও বিলে কচুরিপানার আগ্রাসী বিস্তার দেখে তিনি হতাশ হয়ে পড়েছেন। শঙ্কায় রয়েছেন চাষাবাদ নিয়ে।

নাটোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক হাবিবুল ইসলাম খান জানান,কী পরিমাণ ফসলি জমি কচুরিপানার নিচে আছে তা তিনি বলতে পারছেন না। তাছাড়া অপসারণে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে কোনও উদ্যোগও নেওয়া হয়নি।

কৃ/স/জয়

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বিএডিসিতে মহান বিজয় দিবস পালন

1

বিপন্ন রায়েন্দা খাল ঝুঁকিতে সুন্দরবন

2

দেশে ক্ষুদ্র কৃষকের বার্ষিক আয় ৩৪ হাজার টাকার কম

3

কৃষকদের সৌরবিদ্যুৎ চালিত পানির পাম্প দেওয়া হবে : প্রধানমন্ত্

4

কোনো ধরনের অনিয়ম দুর্নীতি সহ্য করা হবেঃ কৃষিমন্ত্রী

5

তিন বছরে অগ্রগতি ২২ শতাংশ, এবার কি গতি ফিরবে পার্টনারে?

6

মাছের আঁশ বেচে আয় জেলে পরিবারের

7

নদীর তীরে ভেসে এলো মৃত তিমি

8

বাংলাদেশে উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে যা বলল নয়াদিল্লি

9

বড় বাজেট, কৃষির হিস্যা ছোট

10

উৎপাদন বাড়লেও সংকট কাটছে না চা-শিল্পে

11

৩৪ বছর ধরে গাছ লাগাচ্ছেন ইমাম

12

আজ ৮ অঞ্চলে ঝড়ের পূর্বাভাস

13

হাঁস পালনে ফজলুর মাসে আয় ৩ লাখ

14

সংসদের সম্মতি থাকলে পুরাতন ডিলার বাদ দিয়ে নতুন নিয়োগ: প্রধান

15

রাজশাহীতে ৩০ হাজার বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন

16

হাওরে দুইবার ভুট্টা ঘাস চাষের উদ্যোগ

17

চালকলের বর্জ্য বিপন্ন কৃষি জমি

18

মাল্টা-কমলার বাগানে রাজুর ভাগ্য

19

চাঁই ফাঁদ ব্যবহারে মাছের বংশ ধ্বংস

20