কৃষি সময়
প্রকাশ : Jan 17, 2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

ধানের ‘ক্লোনিং’ প্রযুক্তিতে অভূতপূর্ব সাফল্য, বীজ কোম্পানির একচেটিয়া আধিপত্যের দিন শেষ

বিশ্বব্যাপী খাদ্যনিরাপত্তার ইতিহাসে এক নতুন দিগন্তের সূচনা হতে যাচ্ছে। চীনা কৃষিবিজ্ঞানীরা এমন এক বৈপ্লবিক হাইব্রিড ধান উদ্ভাবন করেছেন, যা বীজের মাধ্যমে নিজেকে ‘ক্লোন’ বা হুবহু প্রতিলিপি তৈরি করতে পারে। এই আবিষ্কারের ফলে প্রতিবছর কৃষকদের চড়া দামে নতুন হাইব্রিড বীজ কেনার চিরাচরিত বাধ্যবাধকতা ভেঙে যাবে। ফলে এই উদ্ভাবন বৈশ্বিক কৃষি অর্থনীতিতে এক বিশাল পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

 

চীনা একাডেমি অব অ্যাগ্রিকালচারাল সায়েন্সেসের অধীনে ‘চায়না ন্যাশনাল রাইস রিসার্চ ইনস্টিটিউট’-এর বিজ্ঞানী ওয়াং কেজিয়ানের নেতৃত্বে গবেষণাটি সম্পন্ন হয়েছে। বিজ্ঞানীরা ধানের প্রজনন প্রক্রিয়ায় ‘এপোমিক্সিস’ পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন, যেখানে নিষেক বা ফার্টিলাইজেশন ছাড়াই বীজ তৈরি হয়। এই নতুন ‘Fix8’ সিরিজের ধানে ক্লোনিংয়ের কার্যকারিতা ৯৯ দশমিক ৭ শতাংশের বেশি, যা প্রথাগত হাইব্রিড ধানের ফলন ধরে রেখে বংশপরম্পরায় একই গুণাগুণ বজায় রাখতে সক্ষম।

 

হাইব্রিড ধান উদ্ভাবনের পর থেকে এর সবচেয়ে বড় বাধা ছিল এর উচ্চমূল্য এবং পুনরুৎপাদনে বাধা। সাধারণ ধানের তুলনায় হাইব্রিড বীজের দাম প্রায় ১০০ গুণ বেশি হয়। চীনে ১ কেজি হাইব্রিড বীজের দাম যেখানে প্রায় ২০০ ইউয়ান (২৮ মার্কিন ডলার), সেখানে নতুন এই ক্লোনিং পদ্ধতিতে বীজের উৎপাদন খরচ ৯৯ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাবে।

 

বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এই প্রযুক্তি বাণিজ্যিকভাবে সফল হলে বাজারে বহুজাতিক বীজ কোম্পানিগুলোর একচেটিয়া আধিপত্য হুমকির মুখে পড়বে। বর্তমানে কৃষকদের প্রতি মৌসুমে নতুন বীজ কিনতে হয়। এতেই তাঁদের আয়ের বড় একটি অংশ চলে যায়। চীনের এই ‘ওয়ান-লাইন’ সিস্টেম এই অর্থনৈতিক শৃঙ্খল ভেঙে কৃষককে স্বাবলম্বী করে তুলবে বলে আশা করা যায়।

 

বিশ্বজুড়ে কয়েক শ কোটি মানুষ যখন তীব্র খাদ্য-সংকটের মুখে, তখন হাইব্রিড ধানের এই ক্লোনিং প্রযুক্তি আশার আলো দেখাচ্ছে। আফ্রিকার বিভিন্ন অংশে সাধারণ ধানের তুলনায় হাইব্রিড ধান প্রায় চার গুণ বেশি ফলন দিতে সক্ষম। যদি এই স্বয়ং-প্রজননশীল হাইব্রিড ধান বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেয়া যায়, তবে সামগ্রিক ধান উৎপাদন দ্বিগুণ করা সম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

 

এই গবেষণায় বিজ্ঞানীরা ‘হুয়াক্সু’ নামক একটি বিশেষ জিন শনাক্ত করেছেন, যার নামকরণ করা হয়েছে একটি চীনা রূপকথার চরিত্র থেকে যা ‘পিতা ছাড়াই জন্ম’ হওয়া বোঝায়। এই জিনের প্রয়োগের ফলে ভ্রূণ গঠন প্রক্রিয়ায় কোনো বাহ্যিক নিষেকের প্রয়োজন হয় না। গবেষণার তৃতীয় প্রজন্ম পর্যন্ত দেখা গেছে, ধানের গুণগত মান বা ফলনের কোনো পরিবর্তন হয়নি।

 

হাইব্রিড ধানের জনক প্রয়াত ইউয়ান লংপিং এই গবেষণার প্রাথমিক পর্যায়ে একে ‘অসাধ্যসাধন’ বলে অভিহিত করেছিলেন। বর্তমানে এই গবেষণার ফলাফল পিয়ার-রিভিউর অপেক্ষায় রয়েছে। দক্ষিণ চীনের হাইনান এবং পূর্বের ঝেজিয়াং প্রদেশে ইতিমধ্যে ছয়টি প্রজাতির ক্লোন ধানের সফল পরীক্ষা চালানো হয়েছে। 

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনের এই প্রযুক্তি কেবল কৃষকদের খরচই কমাবে না, বরং চরম জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে বিশ্বজুড়ে সুলভ ও টেকসই খাদ্য সরবরাহের নিশ্চয়তা দেবে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের চলমান প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতার মধ্যে এই কৃষি বিপ্লব বেইজিংকে বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে এক অনন্য সুবিধাজনক অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

কৃষিপণ্যই হবে দেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি পণ্য-কৃষিমন্ত্রী

1

মজুত করা পেঁয়াজ পচনে দিশেহারা কৃষক

2

রাবার ড্যামের ছিদ্রে ঝুঁকিতে চাষাবাদ

3

৭৩ হাজার গাছ লাগাবে বিজিবি

4

পর্যটন শহরের প্রবেশদ্বারে ময়লার ভাগাড়

5

বৃক্ষ রোপনে আনসার-ভিডিপির ব্যতিক্রমী উদ্যোগ

6

ক্ষুদ্র টিস্যু থেকেই উৎপাদন হচ্ছে রোগমুক্ত চারা

7

নদী দখলের মহোৎসবে

8

নদীতে খাঁচায় রঙিন মাছ চাষাবাদ

9

উল্লাপাড়ায় বাড়ছে আখ চাষাবাদ

10

কৃষি সচিবের রুটিন দায়িত্বে নাসির- উদ-দৌলা

11

হতদরিদ্রদের মাঝে গাভী বিতরণ

12

১০ হাজার কোটি টাকার নতুন কৃষিঋণ তহবিল

13

মধ্যনগর সীমান্তে নৌকাসহ ২৮ গরু জব্দ

14

অভয়নগরে খিরা-শসা যাচ্ছে সারা দেশে

15

তরুণদের উদ্যোগ সড়ক ও প্রতিষ্ঠানে বৃক্ষ রোপন

16

হিলিতে পেঁয়াজের দাম কমেছে কেজিতে ৫ টাকা

17

খামারবাড়ির প্রভাবশালী বঙ্গবন্ধু কর্মচারী পরিষদের নেতারা এখন

18

পুরো গাছই এখন পাখির বাসা

19

অনাবৃষ্টিতে আমনের জমি ফেটে চৌচির

20