কৃষি সময় প্রতিবেদক বিশ্ব
খাদ্য দিবসে কেবল খাদ্যের উৎপাদন বাড়ানো নয়, বরং নিরাপদ ও গুণগত মানসম্পন্ন
খাদ্য নিশ্চিত করার ওপর সর্বোচ্চ জোর দিয়েছেন কৃষি এবং খাদ্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী
মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ। তিনি
বলেছেন, বিশ্বব্যাপী খাদ্যের কোনো প্রকৃত ঘাটতি নেই; খাদ্য অনিরাপত্তা ও অনাহারের মূল
কারণ বৈশ্বিক ব্যবস্থার ত্রুটি। একই সাথে তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, উৎপাদন বাড়াতে গিয়ে অনিয়ন্ত্রিত কীটনাশক ও রাসায়নিকের ব্যবহার
মানুষের জীবনকে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি ও ক্যান্সারের দিকে
ঠেলে দিচ্ছে। এ পরিস্থিতি থেকে
উত্তরণে এবং কৃষিতে নতুন প্রযুক্তি ও পরাগায়নভিত্তিক উদ্ভাবনে
বিজ্ঞানীদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
শুক্রবার
(১৬ অক্টোবর ২০২৬) রাজধানীর ফার্মগেটে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি) অডিটোরিয়ামে বিশ্ব খাদ্য দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক জাতীয় সেমিনারে
প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা
(এফএও), আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিল (আইফাদ) এবং অন্যান্য সহযোগী সংস্থার সমন্বয়ে কৃষি মন্ত্রণালয় এই সেমিনারের আয়োজন
করে। এ বছর দিবসটির
বৈশ্বিক প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে—‘আজকের উদ্ভাবন, আগামীর পুষ্টি’।
কৃষিমন্ত্রী
বলেন, “আজ আমাদের সবচেয়ে
বড় সংকট খাদ্যের কোয়ালিটি বা গুণগত মান।
শুধু বেশি ফলন নয়, যা উৎপাদন হচ্ছে
তা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য কতটা উপকারী—তা দেখতে হবে।
যদি আমাদের উদ্ভাবন মানবকল্যাণেই না আসে, তবে
কেন আজ ৪০ শতাংশ
কৃষক ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছেন?”
অনিয়ন্ত্রিত
কীটনাশকের ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “ঢ্যাঁড়শ বা ভেন্ডির মতো
সবজি ফুল ফোটা থেকে খাওয়ার উপযোগী হতে সময় লাগে মাত্র চার থেকে পাঁচ দিন। কিন্তু এতে যে কীটনাশক প্রয়োগ
করা হচ্ছে, তার ক্ষতিকর প্রভাব মাটিতে ও ফসলে থাকে
অন্তত ২১ দিন। তাহলে
এই খাদ্য আমাদের পেট ভরাবে নাকি মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেবে?” তিনি জানান, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর কীটনাশক নিয়ন্ত্রণে
নজরদারি জোরদার করেছে এবং খামারবাড়িতে গত দুই মাসে
অন্তত পাঁচটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
মাটির
স্বাস্থ্য ও খাদ্যে ভারি
ধাতুর (হেভি মেটাল) উপস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ জানিয়ে কৃষিমন্ত্রী বলেন, দেশে ফরিদপুর অঞ্চলের মাটির মান তুলনামূলক ভালো হলেও অধিকাংশ এলাকার মাটির পিএইচ মাত্রা ৪.৫ থেকে
৫-এর মধ্যে, যা
অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। মাটি ও পানিতে মাত্রাতিরিক্ত
সিসা (লেড) পাওয়া যাচ্ছে। এমনকি চালে প্রায় ২ পিপিএম এবং
হলুদ-আদায় ৫ থেকে ১০
পিপিএম পর্যন্ত ক্ষতিকর সিসা পাওয়া যাচ্ছে, যা দ্রুত দূর
করতে বিজ্ঞানীদের উপায় বের করার তাগিদ দেন তিনি। কৃষি
অর্থনীতি ও কৃষকের অধিকার
রক্ষায় সরকারের পদক্ষেপ তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, দেশের অন্তত ৭৫ ভাগ মানুষের
সাথে কৃষি ও গ্রামের মাটির
সরাসরি সংযোগ রয়েছে। কৃষক লাভবান হলে দেশের সার্বিক অর্থনীতি মজবুত হবে। এজন্য সরকার ফসলের ডিজিটাল রেজিস্ট্রি ও ডাটাবেজ তৈরির
উদ্যোগ নিচ্ছে, যাতে চাহিদা ও উৎপাদনের ভারসাম্য
বজায় থাকে এবং কৃষক কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। সিজনে
টমেটোর কেজি ২ টাকায় নেমে
আসা এবং অন্য সময়ে ২০০ টাকায় বিক্রির অস্থিরতা দূর করে সারা বছর একটি স্থিতিশীল মূল্য বজায় রাখার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।
কৃষি
গবেষণাকে উৎসাহিত করতে বড় ধরনের প্রণোদনার
ঘোষণা দিয়ে মন্ত্রী বলেন, কৃষিতে যুগান্তকারী উদ্ভাবনকারী বিজ্ঞানীদের এককালীন বড় অঙ্কের আর্থিক
সম্মানী প্রদান করা হবে। পাশাপাশি তাঁদের গবেষক দলের সদস্যরা সম্মানিত হবেন এবং মূল উদ্ভাবক আমৃত্যু সম্মানী ভাতা পাবেন। এছাড়া কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানীদের অবসর-পরবর্তী পেনশন সুবিধা চালুর বিষয়টিও সরকার গুরুত্বের সাথে পর্যালোচনা করছে।
বিশ্বের
বর্তমান খাদ্য চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে মন্ত্রী আরও বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে এখন ‘নন-জিএমও’ (Non-GMO) ফসলের ব্যাপক
কদর তৈরি হয়েছে। জিন পরিবর্তন না করে প্রাকৃতিক
পরাগায়ন ও স্থানীয় জাতগুলোর
উন্নয়নের মাধ্যমে নিরাপদ ও ভ্যালু-অ্যাডেড
খাদ্য উৎপাদনের আহ্বান জানান তিনি। একই সাথে উচ্চশিক্ষিত তরুণ প্রজন্মের কৃষিতে ফিরে আসাকে তিনি দেশের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনার জায়গা
বলে উল্লেখ করেন।
অনুষ্ঠানে
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার
(এফএও) বাংলাদেশ প্রতিনিধি জিয়াওকুন শি বলেন, ক্ষুধা
ও অপুষ্টি মোকাবেলায় পুরো খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খলে সমন্বিত উদ্ভাবন ও ঐতিহ্যগত জ্ঞানের
সঠিক সমন্বয় ঘটাতে হবে। আইফাদ-এর কান্ট্রি ডিরেক্টর
ভ্যালেন্টাইন অচেনচো ক্ষুদ্র কৃষকের অর্থায়ন ও বাজার সুবিধা
বৃদ্ধির ওপর জোর দেন।
সেমিনারে
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগের প্রধান ড. খন্দকার মো.
ইফতেখারুদ্দৌলা।
কৃষি
মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সেলিম খানের সভাপতিত্বে সেমিনারে স্বাগত বক্তব্য দেন অতিরিক্ত সচিব মোস্তফা কামাল। সেমিনারে সরকারি-বেসরকারি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, গবেষক, বিজ্ঞানী ও উন্নয়ন সহযোগী
সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।